Corn

উন্নত জাতের ভুট্টার নাম সমূহ

ভুট্টা বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ফসল। এটি শুধু গবাদিপশুর খাদ্য হিসেবেই নয়, মানুষের খাদ্য ও শিল্পকারখানার কাঁচামাল হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। আমাদের দেশে ধান ও গমের পর সবচেয়ে বেশি চাষ হয় ভুট্টার। বিশেষ করে উন্নত জাতের ভুট্টা চাষ করে কৃষকরা অধিক ফলন পাচ্ছেন এবং তাদের আয়ও বেড়েছে। কিন্তু অনেকেই এখনো উন্নত ভুট্টা সম্পর্কে বিস্তারিত জানেন না। তাই আজকের এই লেখায় আমরা উন্নত ভুট্টা কী, এর বিভিন্ন জাত এবং এর গুরুত্ব সম্পর্কে বিস্তারিত জানব।

উন্নত ভুট্টা কি?

উন্নত ভুট্টা হলো এমন এক ধরনের ভুট্টা, যা প্রচলিত জাতের তুলনায় বেশি ফলন দেয়, রোগবালাই প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি, এবং জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে সক্ষম। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান উন্নত জাতের ভুট্টা উদ্ভাবনে কাজ করে যাচ্ছে।

উন্নত ভুট্টার দানা বড়, শীষে দানার সংখ্যা বেশি, এবং এটি দ্রুত পরিপক্ক হয়। এসব জাত সাধারণত স্বল্প সময়ের মধ্যে ভালো ফলন দেয় এবং কৃষকদের জন্য লাভজনক। উন্নত ভুট্টার একটি বড় সুবিধা হলো, এটি খরা, জলাবদ্ধতা এবং অতিরিক্ত ঠান্ডা বা গরমের মতো প্রতিকূল আবহাওয়ায়ও টিকে থাকতে পারে।

বাংলাদেশে যে উন্নত ভুট্টার জাতগুলো চাষ হচ্ছে, সেগুলোর বেশিরভাগই উচ্চ ফলনশীল এবং গবাদিপশুর খাদ্য, খাদ্যশস্য ও শিল্প কারখানার কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার উপযোগী। এসব জাত কৃষকদের আয় বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

বর্তমানে দেশে কৃষকদের মধ্যে ভুট্টা চাষের জনপ্রিয়তা বাড়ছে, বিশেষ করে উত্তরবঙ্গ এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে। কারণ এই অঞ্চলে জমির উর্বরতা ও আবহাওয়া ভুট্টা চাষের জন্য উপযোগী। উন্নত জাতের ভুট্টার চাষ করলে কম সময়ে বেশি লাভ করা সম্ভব, যা কৃষকদের জীবনমান উন্নত করতে সাহায্য করছে।

উন্নত জাতের ভুট্টার নাম সমূহ

বাংলাদেশে বেশ কয়েকটি উন্নত জাতের ভুট্টা চাষ করা হয়, যা উচ্চ ফলনশীল এবং রোগ প্রতিরোধী। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি জাত হলো—

১. বারি ভুট্টা-৭

বারি ভুট্টা-৭ একটি উচ্চ ফলনশীল জাত, যা বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) কর্তৃক উদ্ভাবিত। এই জাতটি খরা সহনশীল এবং তুলনামূলক কম পানি প্রয়োজন হয়।

এটি সাধারণত ৯৫-১০০ দিনের মধ্যে পরিপক্ক হয় এবং প্রতি হেক্টরে ১০-১২ টন ফলন দিতে পারে। এর দানাগুলো হলুদ বর্ণের এবং এতে প্রোটিনের পরিমাণ বেশি থাকে। তাই এটি খাদ্যশস্য ও প্রাণিখাদ্য উভয়ের জন্য বেশ উপযোগী।

এছাড়া, বারি ভুট্টা-৭ জাতটি রোগ প্রতিরোধী হওয়ায় কৃষকরা সহজেই এটি চাষ করতে পারেন। বাজারমূল্যও তুলনামূলক বেশি হওয়ায় এটি চাষ করে কৃষকরা ভালো লাভ করতে পারেন।

২. বারি ভুট্টা-৯

বারি ভুট্টা-৯ উন্নত জাতের একটি ভুট্টা, যা প্রধানত গবাদিপশুর খাদ্য এবং শিল্পে ব্যবহারের জন্য উৎপাদন করা হয়। এটি উচ্চ ফলন দেয় এবং সহজেই সংরক্ষণ করা যায়।

এই জাতটি ১০০-১১০ দিনের মধ্যে পরিপক্ক হয় এবং এর দানা বেশ বড় হয়। এটি সাধারণত প্রতি হেক্টরে ১১-১৩ টন ফলন দিতে সক্ষম। বাংলাদেশে এর জনপ্রিয়তা দিন দিন বাড়ছে, বিশেষ করে বাণিজ্যিক কৃষকদের মধ্যে।

৩. সুপার মাক্স ভুট্টা

সুপার মাক্স ভুট্টা মূলত উচ্চ ফলনশীল একটি সংকর জাত। এটি অন্যান্য জাতের তুলনায় বেশি শীষ ধরে এবং ফলনও বেশি হয়।

এই জাতটি ৯০-৯৫ দিনের মধ্যে পরিপক্ক হয় এবং প্রতি হেক্টরে ১২-১৪ টন ফলন দিতে পারে। খরা প্রতিরোধী হওয়ায় এটি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সহজেই চাষ করা যায়।

৪. পায়োনিয়ার ভুট্টা

পায়োনিয়ার ভুট্টা মূলত একটি বাণিজ্যিক জাত, যা উচ্চ ফলন দেয়। এটি দ্রুত বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয় এবং রোগ প্রতিরোধী।

এই জাতটি ১০০ দিনের মধ্যে পরিপক্ক হয় এবং প্রতি হেক্টরে ১০-১৩ টন ফলন দিতে পারে। এটি মূলত প্রাণিখাদ্য ও খাদ্যশস্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

৫. কেসিএস-৭৫৮১ ভুট্টা

এই জাতটি উচ্চ ফলনশীল এবং খরা প্রতিরোধী। এটি দ্রুত পরিপক্ক হয় এবং কম সময়ে ভালো ফলন দেয়।

৬. এনকে-৪০ ভুট্টা

এনকে-৪০ একটি উন্নত জাতের ভুট্টা, যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি এবং স্বল্প সময়ের মধ্যে বেশি ফলন দেয়।

৭. বারি ভুট্টা-১৫

এটি উচ্চ ফলনশীল একটি জাত, যা প্রধানত খাদ্যশস্য ও পশুখাদ্যের জন্য ব্যবহৃত হয়।

৮. হাইব্রিড ভুট্টা (সি.পি-৮৮৮)

এই জাতটি অত্যন্ত উচ্চ ফলনশীল এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সফলভাবে চাষ হচ্ছে।

৯. বারি ভুট্টা-১০

এটি বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় জাত, যা দ্রুত পরিপক্ক হয় এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি।

বহুল জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন ও উত্তর সমূহ

“উন্নত জাতের ভুট্টার নাম সমূহ” এই বিষয়ে আপনার মনে বেশ কয়েকটি প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে? তাহলে চলুন জেনে নেই সেই সকল প্রশ্ন ও উত্তরগুলো-

ভুট্টা কোন মাটিতে ভালো হয়?

ভুট্টা দোআঁশ ও বেলে দোআঁশ মাটিতে ভালো হয়। পানি নিষ্কাশনের ভালো ব্যবস্থা থাকলে ফলন আরও ভালো হয়।

ভুট্টা কীভাবে সংরক্ষণ করতে হয়?

ভুট্টা শস্য ভালোভাবে শুকিয়ে বায়ুরোধী পাত্রে সংরক্ষণ করতে হয়, যাতে এটি পোকামাকড় বা আর্দ্রতার কারণে নষ্ট না হয়।

উপসংহার

উন্নত জাতের ভুট্টা চাষ বাংলাদেশের কৃষকদের জন্য একটি বড় আশীর্বাদ। এসব জাত উচ্চ ফলনশীল, রোগ প্রতিরোধী এবং সহজ চাষযোগ্য হওয়ায় কৃষকরা দ্রুত লাভবান হচ্ছেন। তাছাড়া, ভুট্টার ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে—মানুষের খাদ্য, প্রাণিখাদ্য এবং শিল্প কারখানায় এর চাহিদা বেড়েই চলেছে।

ভুট্টা চাষে আধুনিক প্রযুক্তি ও উন্নত জাত ব্যবহারের ফলে কৃষিক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। কৃষকদের উৎসাহিত করতে সরকারের পক্ষ থেকে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা আরও বাড়ানো প্রয়োজন। এভাবে ভুট্টা চাষের সম্প্রসারণ দেশের কৃষি অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *