টনসিল হলে কি কি খাওয়া যাবে না?
আজ আমি তোমার সাথে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় নিয়ে কথা বলব, যা আমাদের প্রায় সবার জীবনে কখনো না কখনো ঘটে থাকে — তা হলো টনসিল। আমাদের বাংলাদেশে এই সমস্যাটি অনেক পরিচিত। ছোটবেলা থেকে বড়বেলা পর্যন্ত ঠাণ্ডা, ধুলো বা দূষিত খাবারের কারণে আমরা প্রায়ই টনসিলের সমস্যায় ভুগি। তবে আমরা অনেকেই টনসিল সম্পর্কে সঠিকভাবে জানি না এবং জানি না এই সমস্যার সময় কী করা উচিত বা কী কী খাবার এড়িয়ে চলা উচিত। তাই আজকের এই লেখাটি তোমার জন্যই, যাতে তুমি সহজেই বুঝতে পারো টনসিল কী, কেন হয় এবং কোন খাবার থেকে দূরে থাকলে দ্রুত আরাম পাওয়া যায়। চলো, তাহলে শুরু করা যাক।
টনসিল কি?
টনসিল হলো আমাদের মুখের ভেতরের দু’পাশে গলার ওপরে থাকা দুটি ছোট মাংসপিণ্ডের মতো অংশ, যা আমাদের দেহের প্রাকৃতিক সুরক্ষা ব্যবস্থা বা ইমিউন সিস্টেমের একটি অংশ। যখন আমরা কোনো দূষিত খাবার খাই বা ধুলাবালির সংস্পর্শে আসি, তখন টনসিল সেই জীবাণু ও ভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সাহায্য করে। তবে অনেক সময় এই টনসিল নিজেই আক্রান্ত হয়ে যায়। তখনই আমাদের গলা ব্যথা, ঢোক গিলতে সমস্যা, জ্বর এবং মুখে দুর্গন্ধের মতো উপসর্গ দেখা দেয়। টনসিল ফুলে যায় এবং লাল হয়ে যায়।
অনেক সময় টনসিলের উপর সাদা রঙের দাগ বা পুঁজও দেখা যায়। এটিকে আমরা সাধারণভাবে টনসিলের সংক্রমণ বা টনসিলাইটিস বলে থাকি। টনসিলের সমস্যা শিশুদের মধ্যে বেশি দেখা দিলেও বড়দেরও হয়। এই রোগ সাধারণত ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া বা ঠাণ্ডার কারণে হয়। ঠাণ্ডা পানি, বরফ, অতিরিক্ত মিষ্টি বা তেল-চর্বিযুক্ত খাবারও টনসিলের কারণ হতে পারে। কারো কারো ক্ষেত্রে এটি বারবার হতে থাকে। তখন চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হয় এবং কখনো কখনো অস্ত্রোপচার বা টনসিল অপসারণও করতে হতে পারে। তবে সবার আগে জানতে হবে টনসিল হলে কীভাবে নিজের যত্ন নিতে হয় এবং কোন খাবার এড়িয়ে চলতে হবে। কারণ, খাবারের উপর নির্ভর করেই টনসিল দ্রুত ভালোও হতে পারে, আবার খারাপও হয়ে যেতে পারে।
টনসিল হলে কি কি খাওয়া যাবে না
টনসিল হলে আমাদের শরীর খুব স্পর্শকাতর হয়ে যায়। তখন এমন অনেক খাবার আছে যা খাওয়া উচিত নয়। কারণ এই খাবারগুলো টনসিলের ফোলাভাব আরও বাড়িয়ে দেয় এবং সংক্রমণকে জটিল করে তুলতে পারে। এছাড়াও কিছু খাবার গলা শুকিয়ে দেয়, চুলকানি বাড়ায় এবং গলা ব্যথাকে আরও কষ্টদায়ক করে তোলে। আসো, এখন আমি তোমাকে বুঝিয়ে বলি টনসিল হলে কোন কোন খাবার খাওয়া যাবে না এবং কেন যাবে না।
১। ঠাণ্ডা পানি ও বরফজাত খাবার
টনসিল হলে প্রথমেই যেটা পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে, তা হলো ঠাণ্ডা পানি এবং বরফজাত খাবার। কারণ, ঠাণ্ডা খাবার গলার মিউকাস মেমব্রেনকে আরও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করে তোলে। গলা শুষ্ক ও আরামহীন হয়ে যায় এবং জীবাণুর আক্রমণ আরও বাড়িয়ে দেয়। ঠাণ্ডা পানি বা আইসক্রিম খেলে গলা হঠাৎ জড়িয়ে যায় এবং সেখানকার রক্ত চলাচল ব্যাহত হয়। ফলে সংক্রমণ আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। অনেকেই ভাবে ঠাণ্ডা খেলে স্বস্তি পাওয়া যাবে, কিন্তু বাস্তবে এটি বিপদ বাড়িয়ে তোলে। বরফ খেলে বা ঠাণ্ডা পানি পান করলে গলার প্রদাহ বেশি সময় পর্যন্ত থাকে এবং পুঁজ জমার ঝুঁকিও থাকে। তাই টনসিলের সময় এসব খাবার থেকে দূরে থাকাটাই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।
২। অতিরিক্ত মিষ্টি খাবার
টনসিল হলে মিষ্টি খাবার একেবারেই এড়িয়ে চলা উচিত। মিষ্টি খাবার যেমন কেক, মিষ্টি, চকলেট বা মিষ্টি পানীয় টনসিলের আশেপাশে জীবাণুর বংশবৃদ্ধি ঘটায়। চিনিযুক্ত খাবার মুখের লালার স্বাভাবিক ক্ষমতাকে কমিয়ে দেয়। ফলে গলার চারপাশে শুকিয়ে যায় এবং ব্যাকটেরিয়া সহজেই বাসা বাঁধে। মিষ্টি খেলে গলার শ্লেষ্মা পুরু হয়ে যায়, যার কারণে ঢোক গিলতে সমস্যা হয় এবং গলা ব্যথা আরও বেড়ে যায়। এছাড়াও চিনির কারণে শরীরে অতিরিক্ত ক্যালরি জমে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমতে থাকে। ফলে টনসিলের সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
৩। ভাজাপোড়া ও তেল চর্বিযুক্ত খাবার
টনসিলের সময় সবচেয়ে ক্ষতিকর খাবারের তালিকায় রয়েছে ভাজাপোড়া। যেমন: সিঙ্গারা, সমোসা, পুরি, চিপস বা ফাস্টফুড। এগুলো গলায় আরও বেশি জ্বালা সৃষ্টি করে এবং গলার চারপাশে চুলকানি বাড়িয়ে দেয়। তেল ও মসলার কারণে টনসিলের ফোলাভাব বেশি হয় এবং গলা আরও ভারী লাগে। ভাজাপোড়া খেলে লিভারের উপরও চাপ পড়ে, ফলে শরীর দুর্বল হয়ে যায়। আর টনসিলের সময় শরীর দুর্বল থাকলে রোগ সারতে অনেক বেশি সময় লাগে। তাই এই সময়ে যতটা সম্ভব হালকা এবং সহজে হজমযোগ্য খাবার খাওয়া উচিত।
৪। মসলা ও ঝালযুক্ত খাবার
টনসিল হলে ঝাল বা মসলাদার খাবার পুরোপুরি নিষিদ্ধ। এই ধরনের খাবার গলার ভেতর আরও বেশি জ্বালাপোড়া তৈরি করে। মসলা গলার শ্লেষ্মা নষ্ট করে দেয় এবং গলার দেয়ালে ক্ষত তৈরি করে। ঝাল খেলে কাশি বাড়ে, এবং সেই কাশি আবার টনসিলের উপর চাপ ফেলে। ফলে সংক্রমণ আরও বাড়ে এবং গলা লাল হয়ে যায়। ঝাল বা মসলা গলার টিস্যুকে আরও বেশি সংবেদনশীল করে তোলে। তাই এই সময়ে ফ্যাকাশে, মৃদু স্বাদের খাবার খাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
৫। ঠাণ্ডা দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার
টনসিলের সময় অনেকেই ভুল করে দুধ বা দই খেয়ে ফেলে, বিশেষ করে ঠাণ্ডা অবস্থায়। কিন্তু এটি টনসিলের সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। ঠাণ্ডা দুধ বা আইসক্রিম গলার ভেতর ঠাণ্ডা সৃষ্টি করে এবং সংক্রমণকে জটিল করে তোলে। দুধের মধ্যে থাকা ল্যাকটোজও অনেক সময় শ্লেষ্মা জমতে সাহায্য করে। ফলে গলা আটকে যায় এবং কাশি বেড়ে যায়। তাই দুধ খেতে চাইলে উষ্ণ করে খাওয়া উচিত এবং একেবারেই বেশি না খাওয়াই ভালো।
৬। কোলা, সফট ড্রিংকস ও কার্বনেটেড পানীয়
কোলা বা সফট ড্রিংকসের মধ্যেও বিপজ্জনক উপাদান থাকে যা টনসিলের জন্য মারাত্মক। এই ধরনের পানীয়তে গ্যাস থাকে, যা গলার ভেতর জ্বালা সৃষ্টি করে। গলার ফোলাভাব আরও বেড়ে যায় এবং মুখে দুর্গন্ধও শুরু হয়। এছাড়াও কোলার মধ্যে থাকা অতিরিক্ত চিনি জীবাণুদের সহজে ছড়িয়ে পড়তে সাহায্য করে। ঠাণ্ডা কার্বনেটেড পানীয় টনসিলের প্রদাহ দীর্ঘস্থায়ী করে তোলে। তাই এই সময়ে ঠাণ্ডা পানি তো নয়ই, বরং কোলা বা যে কোনো সফট ড্রিংক থেকে ১০০% দূরে থাকা উচিত।
৭। শক্ত বা শুকনো খাবার
টনসিলের সময় শুকনো বা শক্ত খাবার যেমন: খাস্তা বিস্কুট, বাদাম, মুড়ি বা শক্ত রুটি খাওয়া উচিত নয়। কারণ, এই ধরনের খাবার গলার নরম টিস্যুগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। গলায় আঁচড় পড়ে এবং সেই ক্ষতস্থানে ব্যাকটেরিয়া আরও সহজে আক্রমণ করতে পারে। ফলে টনসিলের সংক্রমণ আরও বেড়ে যায় এবং ব্যথা সহ্য করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। তাই এই সময়ে নরম, তরল বা সহজে গিলে নেওয়া যায় এমন খাবার খাওয়া উচিত।
৮। ধূমপান ও ধোঁয়া-যুক্ত পরিবেশ
টনসিলের সময় ধূমপান বা ধোঁয়াযুক্ত কোনো পরিবেশে থাকা একদম উচিত নয়। ধোঁয়া গলার মিউকাস মেমব্রেনকে শুকিয়ে দেয় এবং প্রদাহের পরিমাণ দ্বিগুণ করে ফেলে। ধূমপানের ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ টনসিলের সংক্রমণকে আরও ভয়ঙ্কর করে তোলে। এমনকি ধূমপান করলে টনসিলের স্থায়ী ক্ষতি হতে পারে। তাই টনসিলের সময় ধূমপান সম্পূর্ণভাবে বর্জন করা উচিত এবং ধোঁয়াযুক্ত পরিবেশ থেকে দূরে থাকতে হবে।
বহুল জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন ও উত্তর সমূহ
“টনসিল হলে কি কি খাওয়া যাবে না?” এই বিষয়ে আপনার মনে বেশ কয়েকটি প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে? তাহলে চলুন জেনে নেই সেই সকল প্রশ্ন ও উত্তরগুলো-
টনসিল কি পুরোপুরি ভালো হয়ে যায়?
হ্যাঁ, সঠিক চিকিৎসা, বিশ্রাম এবং খাদ্য নিয়ম মানলে টনসিল পুরোপুরি ভালো হয়ে যায়। তবে যারা বারবার সমস্যায় পড়ে, তাদের চিকিৎসকের পরামর্শে টনসিল অপসারণ করতেও হতে পারে।
টনসিলের সময় কি গরম পানি উপকারী?
হ্যাঁ, টনসিলের সময় গরম পানির কুলিকুচি এবং গরম পানি পান করা খুবই উপকারী। এটি গলার প্রদাহ কমায় এবং আরাম দেয়।
উপসংহার
বন্ধু, আশা করি এখন তুমি বুঝতে পারলে টনসিল কী এবং এই সময়ে কী কী খাবার থেকে দূরে থাকা উচিত। মনে রেখো, টনসিল কোনো ছোটখাটো সমস্যা নয়। শুরুতেই সচেতন না হলে এটি বড় আকার নিতে পারে। তাই টনসিল হলে যথেষ্ট বিশ্রাম নিতে হবে, গরম পানির কুলিকুচি করতে হবে, এবং সঠিক খাবার খেতে হবে। আর যেসব খাবার টনসিলের জন্য ক্ষতিকর, তা থেকে যতদূর সম্ভব দূরে থাকতে হবে। তোমার নিজের যত্ন নাও, পরিবারের অন্যদেরও সচেতন করো। সুস্থ থাকো, ভালো থাকো।